Biometric Voting PIL: নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ফেরাতে এবং জালিয়াতি পুরোপুরি বন্ধ করতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে পারে দেশের শীর্ষ আদালত। সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে সুপ্রিম কোর্ট পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের পরিচয় নিশ্চিতে আঙুলের ছাপ (Fingerprint) এবং আইরিস স্ক্যানার (Iris Scanner) ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এই মর্মে ভারতের নির্বাচন কমিশন (ECI) এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জবাব তলব করেছেন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চ। মূলত একটি জনস্বার্থ মামলার (PIL) প্রেক্ষিতেই এই নোটিশ জারি করা হয়েছে।
সূচিপত্র
আদালতের পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশিকা
আইনজীবী অশ্বিনী কুমার উপাধ্যায় এই মামলাটি দায়ের করেছিলেন, যার নম্বর W.P.(C) NO. 383/2026। শুনানি চলাকালীন আদালত অবশ্য স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, সামনেই যে রাজ্যগুলিতে বিধানসভা নির্বাচন রয়েছে, সেখানে এখনই এই পদ্ধতি কার্যকর করা সম্ভব নয়। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের মতে, ভোটকেন্দ্রে বায়োমেট্রিক ব্যবস্থা চালু করতে হলে একদিকে যেমন নির্বাচনী নিয়মে বড়সড় রদবদল আনতে হবে, তেমনই প্রয়োজন হবে বিপুল অঙ্কের বাজেটের। তবে বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ হলো, নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখার জন্য যে কোনো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের রয়েছে। আপাতত কেন্দ্র ও কমিশনকে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে বলেছে আদালত।
মামলাকারীর যুক্তি ও দাবি
সংবিধানের ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এই পিটিশন দাখিল করেছিলেন অশ্বিনী কুমার উপাধ্যায়। তাঁর দাবি, জনপ্রতিনিধিত্ব আইন ১৯৫০-এর ২৩(৪) ধারা মেনে আধার কার্ডকে যখন বৈধ পরিচয়পত্র হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে, তখন কেন প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার হবে না? তিনি আদালতে জানান, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মৃত ব্যক্তিদের নামে ভোট দেওয়া, প্রক্সি ভোটিং এবং ভুয়া ভোটারদের দাপট এখনও অব্যাহত। এটি সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর বড় আঘাত।
গত ২৮ মার্চ ২০২৬ তারিখে তিনি মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে এই বিষয়ে একটি স্মারকলিপি দিয়েছিলেন। কিন্তু সেখান থেকে কোনো সদর্থক সাড়া না মেলায় শেষ পর্যন্ত তিনি আদালতের দ্বারস্থ হন। তাঁর মতে, যেহেতু আঙুলের ছাপ বা চোখের মণি (Iris) নকল করা অসম্ভব, তাই এই বায়োমেট্রিক পদ্ধতি চালু হলে ‘এক নাগরিক, এক ভোট’ নীতিটি প্রকৃত অর্থেই বাস্তবায়িত হবে।
সরকারি কর্মচারীদের ভোট ডিউটিতে সম্ভাব্য প্রভাব
পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষক ও সরকারি কর্মচারীদের একটি বিশাল অংশকে প্রতি নির্বাচনে প্রিসাইডিং বা পোলিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব সামলাতে হয়। বর্তমানে ভোটার কার্ড (EPIC) পরীক্ষা করা এবং ১৭এ (17A) রেজিস্টারে সই করানোর চিরাচরিত পদ্ধতিতেই ভোটগ্রহণ চলে। তবে ভবিষ্যতে বায়োমেট্রিক পদ্ধতি চালু হলে তাঁদের কাজের ধরনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসবে:
- ইভিএম (EVM) পরিচালনার পাশাপাশি বায়োমেট্রিক ও ফেস রিকগনিশন যন্ত্র ব্যবহারের জন্য সরকারি কর্মীদের উন্নত প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হবে।
- প্রতিটি ভোটারের বায়োমেট্রিক তথ্য মেলাতে কিছুটা বাড়তি সময় লাগতে পারে। ফলে বুথের লম্বা লাইন সামলানো এবং নির্দিষ্ট সময়ে ভোট প্রক্রিয়া শেষ করা পোলিং অফিসারদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
- অন্যদিকে এর একটি বড় সুবিধা হলো, ভোটারদের পরিচয় নিয়ে পোলিং এজেন্টদের সাথে বুথের ভেতরে যে প্রায়ই বচসা বা অশান্তি হয়, তা চিরতরে বন্ধ হবে।
- স্বচ্ছতা নিশ্চিত হওয়ায় প্রিসাইডিং অফিসাররা অনেক বেশি নিশ্চিন্তে এবং চাপমুক্তভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।
শুনানির শেষ পর্যায়ে আদালত জানিয়েছে, এই বিশাল কর্মকাণ্ড সফল করতে রাজ্য সরকারগুলির পূর্ণ সহযোগিতা অপরিহার্য। প্রথমে আদালত সরাসরি নোটিশ দিতে দ্বিধা করলেও, শেষ পর্যন্ত বৃহত্তর জনস্বার্থের কথা ভেবে কেন্দ্র ও কমিশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে জবাব দিতে বলেছে। আগামী লোকসভা বা বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই বিষয়ে চূড়ান্ত কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছেন দেশের সাধারণ ভোটার থেকে শুরু করে নির্বাচনী কাজে যুক্ত সরকারি কর্মচারীরা।