Income Tax: স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে আর্থিক লেনদেন নতুন কিছু নয়। তবে এই আদান-প্রদান নিয়ে করদাতাদের মনে প্রায়ই নানা বিভ্রান্তি দানা বাঁধে। বিশেষ করে স্ত্রীকে টাকা দেওয়ার পর সেই টাকা থেকে যদি কোনও আয় হয়, তবে করের দায় কার ঘাড়ে পড়বে, সেটাই বড় প্রশ্ন। কর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনি মারপ্যাঁচে না ফেঁসে স্ত্রীকে নিছক উপহার দেওয়ার বদলে লোন বা ঋণ হিসেবে টাকা দিলে করের বোঝা কমানো সহজ হতে পারে।
আইন ঠিক কী বলছে? আয়কর আইন ১৯৬১-এর ৬৪ নম্বর ধারা এবং আগামী ১ এপ্রিল ২০২৬ থেকে কার্যকর হতে চলা নতুন আয়কর আইন ২০২৫-এর ৯৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী, ‘ক্লাবিং অফ ইনকাম’ (Clubbing of Income)-এর বিষয়টি বেশ কঠোর। নিয়মটা হলো, কোনও ব্যক্তি যদি তাঁর স্ত্রীকে পর্যাপ্ত বিনিময় মূল্য ছাড়া সম্পত্তি বা অর্থ হস্তান্তর করেন, তবে আইনত তা উপহার হিসেবেই গণ্য হবে। এখন সেই উপহারের টাকা যদি স্ত্রী কোথাও বিনিয়োগ করেন এবং সেখান থেকে মুনাফা আসে, তবে সেই আয় দাতার (স্বামীর) আয়ের সঙ্গেই জুড়ে বা ‘ক্লাব’ করে দেওয়া হবে। ফলত, নিজের ট্যাক্স স্ল্যাব অনুযায়ী ওই অতিরিক্ত আয়ের ওপর স্বামীকেই কর গুনতে হবে।
উপহার নাকি ঋণ: কোনটি লাভজনক? ক্লিয়ারট্যাক্সের (ClearTax) কর বিশেষজ্ঞ সিএ চাঁদনি আনন্দন একটি জরুরি বিষয় সামনে এনেছেন। তাঁর মতে, লোন বা ঋণকে আইনি পরিভাষায় কখনওই ‘ট্রান্সফার’ বা হস্তান্তর হিসেবে দেখা হয় না। তাই স্ত্রীকে টাকা দেওয়ার সময় যদি সেটি যথাযথ চুক্তির মাধ্যমে ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়, তবে ক্লাবিংয়ের নিয়ম এড়ানো সম্ভব। এতে ওই বিনিয়োগ থেকে হওয়া লাভ সরাসরি স্ত্রীর ব্যক্তিগত আয় হিসেবে গণ্য হবে। স্ত্রী যদি নিম্ন ট্যাক্স স্ল্যাবে থাকেন, তবে স্বাভাবিকভাবেই পারিবারিক করের বোঝা অনেকটা কমবে।
ক্লাবিং এড়াতে মানতে হবে কিছু কঠোর শর্ত শুধু মুখে ঋণ বললেই আয়কর দফতর তা মেনে নেবে না। এর জন্য মজবুত আইনি ভিত্তি থাকা দরকার:
- লিখিত চুক্তি: পুরো বিষয়টি একটি বৈধ স্ট্যাম্প পেপারে লোন এগ্রিমেন্ট বা ঋণ চুক্তির আকারে লিখে রাখতে হবে।
- সুদের হার: বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঋণের ওপর একটি যুক্তিসঙ্গত সুদের হার ধার্য করা বাধ্যতামূলক।
- ব্যাঙ্ক রেকর্ড: স্ত্রী যে নিয়মিতভাবে আসল টাকা ও সুদ শোধ করছেন, তার স্পষ্ট প্রমাণ থাকতে হবে ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট বা ইএমআই (EMI) রেকর্ডে।
- আয়কর রিটার্ন: যিনি লোন দিয়েছেন, তিনি স্ত্রীর থেকে প্রাপ্ত সুদ নিজের আয় হিসেবে প্রতি বছর আয়কর রিটার্নে (ITR) অবশ্যই দেখাবেন।
নজরদারির মুখে করদাতা মনে রাখা প্রয়োজন, আয়কর দফতর কিন্তু এই ধরনের লেনদেনের ওপর কড়া নজর রাখে। যদি বিনা সুদে লোন দেওয়া হয় বা পরে সেই সুদ মুকুব করে দেওয়া হয়, তবে আধিকারিকরা সেটিকে ছদ্মবেশী ‘উপহার’ হিসেবেই ধরবেন। স্ত্রীকে দেওয়া টাকা দিয়ে যদি শেয়ার বাজার বা ফিক্সড ডিপোজিটে (FD) বিনিয়োগ করে কর বাঁচানোর ফন্দি করা হয়, তবে লেনদেনের প্রতিটি ধাপ খতিয়ে দেখা হতে পারে। শুধু তাই নয়, শেয়ার বাজারে যদি মূলধনী লোকসান (Capital Loss) হয়, তবে ক্লাবিং নিয়মে সেই ক্ষতিও স্বামীর মোট আয়ের সঙ্গেই যুক্ত হবে। এমনকি পর্যাপ্ত বিনিময় ছাড়া নিজের কেনা বাড়ি স্ত্রীর নামে লিখে দিলেও ভাড়ার টাকা স্বামীর আয় হিসেবেই ধরা হবে।
প্রভাব ও সঠিক পরিকল্পনা রাজ্য সরকারি কর্মচারী বা উচ্চ বেতনের চাকুরেদের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে মনে করেন স্ত্রীর নামে স্রেফ শেয়ার কিনলেই দায়মুক্তি ঘটবে, কিন্তু যথাযথ নথি না থাকলে জরিমানাসহ নোটিশ আসার প্রবল আশঙ্কা থাকে। তবে স্বামী ও স্ত্রী মিলে জয়েন্ট হোম লোন নিলে যেমন দুজনেই কর ছাড়ের সুবিধা পান, তেমনই সঠিক আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে ঋণ চুক্তির মাধ্যমে লেনদেন করলে কর সাশ্রয় সম্ভব। সংসারের দৈনন্দিন খরচের জন্য স্ত্রীকে টাকা দিলে তাতে কোনও বাধা নেই। কিন্তু সেই খরচের উদ্বৃত্ত টাকা যদি ব্যাঙ্কে জমিয়ে সুদ পাওয়া যায়, তবে সেই সুদও আপনার আয়ের সঙ্গে ক্লাবিং হতে পারে। তাই সম্পদ হস্তান্তরের চেয়ে আয়ের উৎস ও আইনি পরিকাঠামো ঠিক রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ।
বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ: আয়কর একটি জটিল বিষয় এবং ব্যক্তিবিশেষে এর নিয়মাবলী ভিন্ন হতে পারে। আর্থিক লেনদেন বা কর বাঁচানোর কোনও বড় পদক্ষেপ করার আগে অবশ্যই একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (CA) বা কর বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া বাঞ্ছনীয়।