RBI Digital Payment Rules: অনলাইনে জালিয়াতি করে টাকা হাতিয়ে নেওয়া রুখতে এবার রীতিমতো কোমর বেঁধে নামছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (RBI)। গত ৯ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক একটি খসড়া প্রস্তাব বা ডিসকাশন পেপার প্রকাশ্যে এনেছে। সেখানে সাফ জানানো হয়েছে, ১০,০০০ টাকার বেশি ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে ১ ঘণ্টার একটি ‘কুলিং-অফ পিরিয়ড’ বা বিলম্ব রাখার কথা ভাবা হচ্ছে। মূলত সাইবার অপরাধীরা যেভাবে সাধারণ মানুষকে মানসিক চাপের মুখে ফেলে দ্রুত টাকা হাতানোর ফন্দি আঁটে, সেই ছক ভেঙে দিতেই এই বিশেষ সময়সীমা চালুর প্রস্তাব।
সূচিপত্র
নেপথ্যে আশঙ্কাজনক পরিসংখ্যান
ন্যাশনাল সাইবার ক্রাইম রিপোর্টিং পোর্টাল (NCRP)-এর দেওয়া সাম্প্রতিক তথ্য রীতিমতো কপালে ভাঁজ ফেলার মতো। দেশে সাইবার জালিয়াতির ঘটনা ২০২১ সালে যেখানে ছিল ২.৬ লক্ষ, ২০২৫ সালে তা লাফিয়ে পৌঁছেছে ২৮ লক্ষে। আরবিআই-এর পর্যবেক্ষণ বলছে, মোট প্রতারণার ৪৫ শতাংশই ঘটে ১০,০০০ টাকার বেশি অংকের লেনদেনে। তবে ভয়ের কথা হলো, জালিয়াতির মাধ্যমে খোয়া যাওয়া মোট অর্থের ৯৮.৫ শতাংশই হাতিয়ে নেওয়া হয় এই বড় অংকের ট্রানজ্যাকশনগুলোর মাধ্যমেই। এমতাবস্থায়, এই বিপুল আর্থিক ক্ষতি সামাল দিতে সাধারণ মানুষ ও বিশেষজ্ঞদের মতামত চেয়েছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। নিজের মতামত জানানোর শেষ তারিখ ৮ মে, ২০২৬।
১ ঘণ্টার বিলম্ব আসলে কীভাবে কাজ করবে?
প্রস্তাবিত নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো গ্রাহক যদি ১০,০০০ টাকার বেশি ডিজিটাল ট্রান্সফার (যেমন ইউপিআই বা আইএমপিএস) করেন, তবে সেই টাকা তৎক্ষণাৎ প্রাপকের অ্যাকাউন্টে জমা হবে না। এর মাঝে এক ঘণ্টার একটি বিরতি থাকবে। এই সময়ে প্রেরকের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কেটে নেওয়া হলেও, তিনি চাইলে যে কোনো মুহূর্তে ওই ট্রানজ্যাকশন বাতিল করতে পারবেন। এর পাশাপাশি, ব্যাঙ্ক যদি কোনো সন্দেহজনক গতিবিধি লক্ষ্য করে, তবে তারা গ্রাহককে সতর্ক করবে এবং পুনরায় নিশ্চিত করার জন্য মেসেজ পাঠাবে।
বয়স্ক ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের জন্য বাড়তি রক্ষাকবচ
যেসব গ্রাহকের বয়স ৭০ বছরের বেশি বা যাঁরা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন, তাঁদের নিরাপত্তায় কোনো আপস করতে চাইছে না কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। ৫০,০০০ টাকার বেশি ট্রান্সফারের ক্ষেত্রে তাঁদের মনোনীত একজন ‘নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি’ বা ‘ট্রাস্টেড পার্সন’-এর অনুমোদন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, পরিচয় ভাঁড়িয়ে প্রতারণার শিকার সবচেয়ে বেশি হন প্রবীণ নাগরিকরাই। এই দ্বিমুখী সুরক্ষা ব্যবস্থা তাঁদের কষ্টার্জিত সঞ্চয়কে জালিয়াতদের হাত থেকে রক্ষা করবে।
কিল সুইচ ও হোয়াইটলিস্ট: নিরাপত্তার নতুন দুই অস্ত্র
ডিজিটাল লেনদেনকে নিশ্ছিদ্র করতে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ ফিচারের কথা বলেছে আরবিআই:
- কিল সুইচ (Kill Switch): অ্যাকাউন্টে সামান্যতম সন্দেহজনক কিছু দেখলেই গ্রাহক এক ক্লিকে তাঁর মোবাইল ব্যাঙ্কিং, নেট ব্যাঙ্কিং বা কার্ডের মতো সব ডিজিটাল পেমেন্ট পরিষেবা মুহূর্তের মধ্যে বন্ধ করে দিতে পারবেন।
- হোয়াইটলিস্ট (Whitelist): পরিচিত মানুষ বা নিয়মিত যেসব মার্চেন্টকে টাকা পাঠাতে হয়, তাঁদের নাম এই তালিকায় আগেভাগেই যোগ করা যাবে। এই তালিকার কাউকে টাকা পাঠালে ১ ঘণ্টার বিলম্বের নিয়ম খাটবে না।
রাজ্য সরকারি কর্মচারী ও পেনশনারদের জন্য কী বার্তা?
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারি কর্মচারী এবং অবসরপ্রাপ্ত পেনশনারদের দৈনন্দিন আর্থিক অভ্যাসে এই নিয়মগুলি বড় প্রভাব ফেলবে। প্রথমত, বেতন বা পেনশনের টাকা পাওয়ার পর যদি বড় কোনো পেমেন্ট- যেমন চিকিৎসার বিল বা স্কুল-কলেজের ফি মেটাতে হয়, তবে ১০,০০০ টাকার বেশি লেনদেনের ক্ষেত্রে হাতে এক ঘণ্টা সময় রেখে এগোতে হবে। তবে পরিচিত অ্যাকাউন্টগুলোকে আগেভাগে ‘হোয়াইটলিস্ট’ করে রাখলে এই সমস্যা হবে না।
অন্যদিকে, প্রবীণ পেনশনারদের জন্য ৫০,০০০ টাকার ঊর্ধ্বসীমার নিয়মটি একটি বড় স্বস্তি। বড় অংকের লেনদেনের সময় পরিবারের কোনো বিশ্বস্ত সদস্যের সম্মতি লাগবে বলে তাঁরা সাইবার অপরাধীদের ফাঁদে চট করে পা দেবেন না। সব মিলিয়ে, প্রস্তাবিত এই নিয়মগুলি কার্যকর হলে জালিয়াতির ভয় কাটিয়ে সরকারি কর্মী ও পেনশনাররা অনেক বেশি সুরক্ষিতভাবে ডিজিটাল ব্যাঙ্কিং ব্যবহার করতে পারবেন।