WB DA Calculation Formula: বকেয়া মহার্ঘ ভাতা বা ডিএ মেটানো নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে যে নজরদারি কমিটি গঠন করা হয়েছে, তাদের কাছে এবার নিজেদের গাণিতিক হিসাব ও স্ট্যাটাস রিপোর্ট জমা দিল রাজ্য সরকার। ২০০৮ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত বকেয়া মেটানোর ক্ষেত্রে নবান্ন ঠিক কোন ফর্মুলা মেনে এগোচ্ছে, তারই খুঁটিনাটি এবার প্রকাশ্যে এল এই হলফনামার মাধ্যমে।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি শীর্ষ আদালত এক ঐতিহাসিক নির্দেশে জানিয়েছিল, বকেয়া ডিএ-র অন্তত ২৫ শতাংশ আগামী ৩১ মার্চের মধ্যে মিটিয়ে দিতে হবে। এই গোটা প্রক্রিয়াটির ওপর কড়া নজর রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি ইন্দু মালহোত্রার নেতৃত্বাধীন কমিটিকে। সেই কমিটির কাছেই এখন নিয়মিত সাপ্তাহিক রিপোর্ট ও খরচের খতিয়ান পেশ করছে রাজ্য।
সূচিপত্র
রাজ্যের গাণিতিক মারপ্যাঁচে ডিএ-র নতুন সূত্র
সরকারের দাখিল করা নথি অনুযায়ী, ROPA 2009-এর আওতায় ডিএ-র অঙ্ক কষতে ২০০৮ থেকে ২০১৯ সালকে একটি পূর্ণাঙ্গ কার্যকর চক্র হিসেবে ধরা হয়েছে। এখানে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে ‘বেস ইনডেক্স’-এ। ২০০৭ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত অল ইন্ডিয়া কনজিউমার প্রাইস ইনডেক্স (AICPI)-এর ১২ মাসের গড় ছিল ৬০৫ (১৯৮২=১০০ ভিত্তি করে)। রাজ্য সরকার এই ৬০৫-কেই ডিএ গণনার প্রারম্ভিক বিন্দু বা বেস ইনডেক্স হিসেবে স্থির করেছে।
রাজ্যের ব্যবহৃত হিসাবের সূত্রটি হলো: DA = (গত ১২ মাসের গড় AICPI ইনডেক্স – ৬০৫) ÷ ৬০৫
নবান্নের যুক্তি হলো, ২০০৮ সালের আগে পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির যে প্রভাব ছিল, তা পূর্ববর্তী পে কমিশন বা ROPA-তেই প্রশমিত বা নিউট্রালাইজ হয়ে গেছে। তাই ROPA 2009-এর ডিএ গণনা নতুন করে ১ এপ্রিল ২০০৮ থেকে শুরু হওয়া উচিত এবং সে কারণেই ২০০৭ সালের গড় সূচক ৬০৫-কে ভিত্তি ধরা হয়েছে।
AICPI বনাম WB CPI বিতর্ক
রিপোর্টে রাজ্য সরকার সর্বভারতীয় মূল্যসূচকের (AICPI) পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের নিজস্ব মূল্যসূচক বা WB CPI-এর প্রসঙ্গ টেনে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। রাজ্যের দাবি, আমাদের রাজ্যের নিজস্ব মূল্যসূচক বিচার করলে ১০০ শতাংশ ডিএ-র বদলে ৮৫ শতাংশ দেওয়াটাই বেশি যৌক্তিক। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই যুক্তির আড়ালে বকেয়া ডিএ থেকে ১৫ শতাংশ কমিয়ে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে সরকার। এর ওপর বাড়তি ঋণের বোঝা আর আর্থিক সংকটের দোহাই দিয়ে বলা হয়েছে, পুরো টাকা মেটাতে গেলে রাজ্যের রাজকোষে টান পড়বে। এমনকি তথ্যগত অসংগতি এবং সব তথ্য কম্পিউটারাইজড না থাকাকেও এই বিলম্বের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
বকেয়া ডিএ মেটানোর বর্তমান পরিস্থিতি
বিতর্ক ও গাণিতিক জটিলতার মাঝেই ডিএ প্রদানের কাজ শুরু হয়েছে বলে দাবি করেছে সরকার। রিপোর্টে বলা হয়েছে:
- গ্রুপ এ, বি, সি এবং ডি—সব স্তরের অনেক কর্মীর ব্যাংক বা GPF অ্যাকাউন্টে ইতিমধ্যে সরাসরি টাকা পাঠানো হয়েছে।
- যে সমস্ত কর্মচারী ইতিমধ্যে প্রয়াত হয়েছেন, তাঁদের বকেয়া মেটানোর জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
- পেনশনার ও ফ্যামিলি পেনশনারদের ডিএ বাবদ সরকার ইতিমধ্যে প্রায় ১৪০০ কোটি টাকা রিলিজ করেছে।
সরকারি কর্মচারীদের ওপর এর প্রভাব কী?
রাজ্যের এই নতুন গাণিতিক সূত্রের সরাসরি কোপ পড়বে সরকারি কর্মচারীদের বেতনের ওপর। আদালত যদি শেষ পর্যন্ত সরকারের এই ৬০৫ বেস ইনডেক্স এবং ৮৫ শতাংশ নিউট্রালাইজেশনের তত্ত্ব মেনে নেয়, তবে প্রাপ্য ডিএ-র পরিমাণ এক ধাক্কায় অনেকটা কমে যাবে। গত এক দশকের বকেয়া হিসাব করলে প্রতিটি কর্মীকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে।
নজরদারি কমিটির পরবর্তী পদক্ষেপ
বিচারপতি ইন্দু মালহোত্রা কমিটির কাছে নবান্নকে প্রতি সপ্তাহে হিসাব দিতে হচ্ছে যে, কতজন কর্মীকে কত টাকা দেওয়া হলো। আগামী ২৭ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে এই মনিটরিং কমিটির পরবর্তী বৈঠক বসার কথা রয়েছে। এছাড়া রিপোর্টে কেরল, তেলঙ্গানা, মণিপুর ও ত্রিপুরার মতো রাজ্যের ডিএ হারের সাথে একটি তুলনামূলক আলোচনা করা হয়েছে। রাজ্যের এই কৌশল মামলার আইনি প্রক্রিয়াকে আরও দীর্ঘায়িত করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, সুপ্রিম কোর্ট রাজ্যের এই নতুন ফর্মুলাকে আইনি মান্যতা দেয় কি না।