7th Pay Commission: রাজ্য সরকারি কর্মী ও পেনশনভোগীদের বেতন-ভাতা পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া এখন সক্রিয়। ৮ম কেন্দ্রীয় বেতন কমিশন গঠনের প্রেক্ষাপটে গত ১৮ মে, ২০২৬ মুখ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে রাজ্য মন্ত্রিসভায় সপ্তম রাজ্য বেতন কমিশন গঠনের নীতিগত অনুমোদন মেলে। তার পরেই সামনে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা, কমিশনের কার্যপরিধি বা ‘টার্মস অফ রেফারেন্স’ (ToR) সংক্রান্ত একটি দাবিপত্র, যেখানে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ থেকে শুরু করে অবসরকালীন সুযোগ-সুবিধা পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব রাখা হয়েছে। কর্মচারী মহলের পক্ষ থেকে তুলে ধরা এই দাবিগুলি চূড়ান্ত ToR-এ কতটা প্রতিফলিত হয়, তার উপরেই নির্ভর করছে লক্ষ লক্ষ রাজ্য সরকারি কর্মী-পেনশনভোগীর ভবিষ্যৎ বেতন কাঠামো। আসুন, দেখে নেওয়া যাক এই প্রস্তাবনায় ঠিক কী কী রয়েছে।
সূচিপত্র
ন্যূনতম মজুরি ও পে ম্যাট্রিক্স নির্ধারণে তিনটি বড় বদলের দাবি
বেতন কাঠামোর ভিত গড়া হয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের মধ্য দিয়েই। এই প্রস্তাবনায় তিনটি মূল বদল চাওয়া হয়েছে—
- পরিবারের ইউনিট বৃদ্ধি: আগের বেতন কমিশনগুলিতে পরিবার-পিছু ৩.৫ ইউনিট ধরে হিসেব হত। এবার তা বাড়িয়ে ৫ ইউনিট করার দাবি জানানো হয়েছে।
- ক্যালরি মানদণ্ড পরিবর্তন: ১৯৫৭ সালের ওয়ালেস আয়করয়েড মডেল অনুযায়ী প্রতিদিন ২৭০০ ক্যালরির ভিত্তিতে এতদিন ন্যূনতম বেতন নির্ধারিত হত। তার বদলে ICMR অনুমোদিত ৩৪৯০ ক্যালরির মানদণ্ড গ্রহণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
- ইনক্রিমেন্ট বৃদ্ধি: বার্ষিক ৩ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের পুরনো নিয়ম বদলে অন্তত ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট চালুর দাবি তোলা হয়েছে, যাতে মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে পে-ম্যাট্রিক্স পুনর্গঠন করা যায়।
কেন্দ্রের সঙ্গে বেতন-স্তরে সমতা এবং DA
কেন্দ্রীয় বেতন কমিশনের পে লেভেলের সঙ্গে রাজ্যের পে লেভেলের সামঞ্জস্য আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যাতে অপ্রয়োজনীয় মামলা-মোকদ্দমা এড়ানো যায় এবং অকার্যকর পে লেভেলগুলি একত্রীকরণ করে সর্বভারতীয় সমতা আনা যায়। মহার্ঘ ভাতা (DA) নিয়েও স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া হয়েছে— AICPI/CPI-IW অনুযায়ী DA নির্ধারণের দাবির পাশাপাশি চেন্নাই ইয়ুথ হস্টেল ও বঙ্গ ভবনের কর্মীদের সঙ্গে DA বিতরণে যে বৈষম্য রয়েছে, তা দূর করে AICPI অনুযায়ী DA-র জন্য একটি স্থায়ী নির্দেশ (Standing Order) জারির সুপারিশ করা হয়েছে।
কার্যকরের তারিখ ও ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর
দাবিপত্রে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সপ্তম বেতন কমিশন যেন প্রকৃতপক্ষে (নোশনালি নয়) ০১.০১.২০২৬ তারিখ থেকে কার্যকর হয়। ৮ম কেন্দ্রীয় বেতন কমিশনের আদলে DA-কে বেসিক পে-র সঙ্গে ১০০ শতাংশ মিশিয়ে অভিন্ন ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর ধার্যের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।
ভাতা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ দাবি
- কেন্দ্রীয় বেতন কমিশনের ধাঁচে X, Y, Z শ্রেণির শহরে হাউস রেন্ট অ্যালাউন্স (HRA) ও ট্রান্সপোর্ট অ্যালাউন্সের পুনর্বিবেচনা।
- স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই কেন্দ্র, রাজ্য, UT বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত হলে HRA-র ঊর্ধ্বসীমা প্রত্যাহারের দাবি।
- চিলড্রেন এডুকেশন অ্যালাউন্স (CEA) ও হস্টেল সাবসিডি কেন্দ্রীয় হারের সমান করার প্রস্তাব।
- অন্যান্য প্রচলিত ভাতাগুলির পর্যালোচনা ও যুক্তিসঙ্গত সংশোধনের সুপারিশ।
বর্তমান বনাম প্রস্তাবিত: একনজরে
| বিষয় | বর্তমান ব্যবস্থা | দাবিপত্রে প্রস্তাবিত |
|---|---|---|
| পরিবারের ইউনিট | ৩.৫ | ৫ |
| ক্যালরি মানদণ্ড | ২৭০০ (১৯৫৭ মডেল) | ৩৪৯০ (ICMR) |
| বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট | ৩% | অন্তত ৫% |
| কেরিয়ার অ্যাডভান্সমেন্ট স্কিম | ৩ স্তর (৮-১৫-২৪ বছর) | ৫ স্তর (৫-৮-১২-১৮-২৪ বছর) |
| কমিউটেড পেনশন পুনর্বহাল | ১৫ বছর পর | ১১ বছর পর |
পদোন্নতি, মূল্যায়ন ও কেরিয়ার অ্যাডভান্সমেন্ট স্কিম (CAS)
কর্মদক্ষতা, স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা বাড়াতে পুরনো পদোন্নতি ও মূল্যায়ন নীতি ঢেলে সাজানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে থাকা ৩ স্তরের মডিফায়েড কেরিয়ার অ্যাডভান্সমেন্ট স্কিমের (৮-১৫-২৪ বছর) বদলে ৫ স্তরের একটি নতুন কাঠামো (৫-৮-১২-১৮-২৪ বছর) চালুর দাবি জানানো হয়েছে।
অবসরকালীন সুযোগ-সুবিধা সংক্রান্ত দাবি
- পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টের একাধিক রায়ের প্রেক্ষিতে ১৫ বছরের বদলে ১১ বছর পরে কমিউটেড পেনশন পুনর্বহালের প্রস্তাব।
- Central Civil Services (Leave) Rules, 1972-এর ৩৯(২)(a) ও (b) ধারা অনুযায়ী, অবসরকালে আর্নড লিভের (সর্বোচ্চ ৩০০ দিন) ঘাটতি হাফ পে লিভ (HPL) থেকে পূরণ করে লিভ এনক্যাশমেন্টের সুবিধা দেওয়ার দাবি।
- ৩০ জুন অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের ধাঁচে একটি নোশনাল ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার প্রস্তাব।
স্বাস্থ্য প্রকল্প, সচিবালয় মর্যাদা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দাবি
- ওয়েস্ট বেঙ্গল হেলথ স্কিমের (WBHS) হার আধুনিক চিকিৎসা পরিষেবার নিরিখে সংশোধন, সম্পূর্ণ ক্যাশলেস সুবিধা এবং ডাক্তারদের ফি বৃদ্ধি।
- গ্রান্ট-ইন-এইড পেনশনভোগীদের সরকারি কর্মচারীদের নির্ভরশীল সুবিধাভোগী হিসেবে WBHS-এর আওতায় আনার প্রস্তাব (২০২২ সালের ৩০ ডিসেম্বরের ২২২-F নির্দেশিকা সংশোধন করে)।
- ওয়েস্ট বেঙ্গল সেক্রেটারিয়েট সার্ভিস (WBSS) ও কমন কেডার (CCW)-এর কর্মী-আধিকারিকদের জন্য পৃথক নিয়োগ বিধি ও শিক্ষাগত যোগ্যতার সংশোধনের মাধ্যমে সচিবালয় মর্যাদা পুনর্বহাল।
- কর্মচারী সংগঠনগুলির সঙ্গে সরকারের প্রতিনিধিত্বমূলক যৌথ পরামর্শদাতা কমিটি বা জয়েন্ট কনসালটেটিভ মেশিনারি (JCM) গঠন।
- উৎকর্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে একটি শক্তিশালী পারফরম্যান্স-লিঙ্কড বোনাস স্কিম চালুর সুপারিশ।
এখন কোন পর্যায়ে রয়েছে সপ্তম বেতন কমিশন?
১৮ মে, ২০২৬-এ নীতিগত অনুমোদনের পর, গত ২২ জুলাই, ২০২৬ রাজ্য অর্থ দফতরের বিজ্ঞপ্তিতে সপ্তম বেতন কমিশনের চূড়ান্ত কার্যপরিধি (ToR) প্রকাশিত হয় এবং কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয়। কমিশনের চেয়ারপার্সন করা হয়েছে অবসরপ্রাপ্ত IAS আধিকারিক শ্রী নবীন প্রকাশকে, সদস্য হিসেবে রয়েছেন ড. পার্থ মুখোপাধ্যায় ও ড. পার্থপ্রতিম পাল, এবং সদস্য-সচিব পদে রয়েছেন রাজ্যের অর্থ দফতরের সচিব শ্রী দেবী প্রসাদ কারানাম। কমিশনকে ছয় মাসের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে। গত ২১ জুলাই এক অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী নিজেই জানান, কমিশনের ToR তৈরি হয়ে গিয়েছে এবং চলতি আর্থিক বছরের মধ্যেই তা কার্যকর করার লক্ষ্য নিয়েছে রাজ্য সরকার, পাশাপাশি ধাপে ধাপে কেন্দ্রের সঙ্গে DA-র ব্যবধান কমানোর প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
কর্মী-পেনশনভোগীদের এখন কী করণীয়?
চূড়ান্ত ToR ও কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া এখন সরকারি স্তরে সম্পূর্ণ। তবে বেতন-কাঠামো বা ভাতা সংক্রান্ত কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও ঘোষিত হয়নি। তাই কর্মী ও পেনশনভোগীদের উচিত—
- শুধুমাত্র রাজ্য অর্থ দফতরের অফিসিয়াল বিজ্ঞপ্তি ও সার্কুলারের উপর ভরসা রাখা।
- সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া অনুমান-নির্ভর ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর বা বেতন বৃদ্ধির পরিসংখ্যানে বিভ্রান্ত না হওয়া।
- নিয়মিত DA ও বেতন সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্যের জন্য নির্ভরযোগ্য সূত্র অনুসরণ করা।
সপ্তম বেতন কমিশনের সুপারিশ কবে এবং কী আকারে আসে, সেদিকেই এখন নজর রাজ্যের প্রায় ৮ লক্ষ কর্মী ও পেনশনভোগীর।









