TET Review Petition: আজ ১৩ই মে, ২০২৬ সুপ্রিম কোর্টে টেট (TET) মামলার বহু প্রতীক্ষিত রিভিউ পিটিশনের মৌখিক শুনানি (Oral Hearing) সম্পন্ন হলো। দীর্ঘ প্রায় ১ ঘণ্টা ৫০ মিনিট ধরে চলা এই গুরুত্বপূর্ণ শুনানিতে পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, মেঘালয় সহ বিভিন্ন রাজ্যের আইনজীবীরা কর্মরত বা ইন-সার্ভিস (In-service) শিক্ষকদের পক্ষে জোরালো সওয়াল করেন। বিশেষ করে রেট্রোস্পেক্টিভ ইফেক্ট (Retrospective effect) এবং এনসিটিই (NCTE)-এর ২০১০, ২০১১ ও ২০১৭ সালের নিয়মাবলীর বিষয়গুলি দেশের সর্বোচ্চ আদালতে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আলোচিত হয়েছে।
সূচিপত্র
শুনানিতে বিভিন্ন রাজ্য ও আইনজীবীদের প্রধান দাবি
লাখ লাখ শিক্ষকের চাকরি বাতিলের আশঙ্কার মাঝে বিভিন্ন রাজ্যের এবং সংগঠনের আইনজীবীরা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিচারপতিদের সামনে তুলে ধরেন:
- মেঘালয় ও তামিলনাড়ুর চরম উদ্বেগ: এই দুই রাজ্যের আইনজীবীরা স্পষ্ট জানান যে, বাধ্যতামূলক অবসরের (Compulsory Retirement) নির্দেশ কার্যকর হলে রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে। তাই তারা শিক্ষকদের যোগ্যতামান অর্জনের জন্য আরও চার বছর অতিরিক্ত সময় চেয়েছেন।
- পশ্চিমবঙ্গের জোরালো যুক্তি: রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ২০১৪ সালে টেট পরীক্ষা হওয়ার পর দীর্ঘ সাত বছর পর ২০২১ সালে পুনরায় টেট অনুষ্ঠিত হয়, যা রাজ্যের জন্য একটি বড় সমস্যা ছিল। পশ্চিমবঙ্গ সরকারও শিক্ষকদের জন্য অন্তত আরও চার বছর সময় চেয়েছে এবং প্রতি ছয় মাস অন্তর টেট নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
- কর্মচ্যুতি ও জীবিকার সংকট: রেট্রোস্পেক্টিভ ইফেক্টের ফলে লক্ষাধিক শিক্ষকের চাকরি চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের জীবিকা (Livelihood) কীভাবে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তা নিয়ে আইনজীবীরা আবেগপূর্ণ সওয়াল করেন।
- অল পোস্ট গ্র্যাজুয়েট টিচারস ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন: পশ্চিমবঙ্গের এই সংগঠনের আইনজীবী উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ানো ‘নরমাল সেকশন’-এর বিষয়টি আদালতের বিশেষ দৃষ্টিগোচরে আনেন।
বিচারপতিদের কড়া পর্যবেক্ষণ ও মন্তব্য
বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত এবং বেঞ্চের অন্য বিচারপতিরা এই মামলায় অত্যন্ত কড়া এবং আপোষহীন অবস্থান বজায় রাখেন। তাদের প্রধান পর্যবেক্ষণগুলি ছিল নিম্নরূপ:
- শিক্ষার অধিকার আইন (RTE Act): বিচারপতিরা রাইট টু এডুকেশন অ্যাক্টের উপর সর্বোচ্চ জোর দেন। তারা স্পষ্ট জানান, শিশুদের বাধ্যতামূলক এবং গুণগত শিক্ষা (Quality Education) নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষকদেরও যোগ্যতামান বা ডিগ্রি উন্নত হওয়া একান্ত প্রয়োজন।
- অতিরিক্ত সময়ের সদ্ব্যবহার না করা: আদালত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে, ২০১০ সালের ২৩শে আগস্ট এনসিটিই (NCTE) যখন নিয়ম সংশোধন করে কর্মরত শিক্ষকদের যোগ্যতামান অর্জনের জন্য পাঁচ বছর সময় দিয়েছিল, তখন কেন তা কাজে লাগানো হয়নি? পরবর্তীতে ২০১৭ সালে এইচআরডি (HRD) মিনিস্ট্রি থেকে ১লা এপ্রিল ২০১৯-এর মধ্যে টেট পাস করার রিমাইন্ডার দেওয়া সত্ত্বেও কেন যোগ্যতামান অর্জন করা সম্ভব হয়নি, তা নিয়ে বিচারপতিরা প্রশ্ন তোলেন।
- আদালতের দ্বারস্থ হতে বিলম্ব: বিচারপতিরা মন্তব্য করেন, যদি ২০১০ বা ২০১৭ সালে এতই সমস্যা ছিল, তবে রাজ্যগুলি বা শিক্ষকরা কেন সেই সময়েই মামলা করে আদালতের দ্বারস্থ হননি।
- রাজ্যের দায়িত্ব: ছয় মাস অন্তর টেট নেওয়ার দাবির প্রেক্ষিতে আদালত পরিষ্কার জানিয়ে দেয় যে, টেট কন্ডাক্ট করার সম্পূর্ণ দায়িত্ব রাজ্যের। সুপ্রিম কোর্ট কোনো রাজ্যকে এর জন্য বাধ্য করতে পারে না।
একনজরে টেট রিভিউ পিটিশন মামলা
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
|---|---|
| শুনানির তারিখ | ১৩ই মে, ২০২৬ |
| মূল বিবাদ | RTE Act অনুযায়ী ইন-সার্ভিস শিক্ষকদের জন্য টেট (TET) বাধ্যতামূলক করা |
| রাজ্যগুলির দাবি | টেট পাসের জন্য আরও ৪ বছর অতিরিক্ত সময় প্রদান |
| আদালতের অবস্থান | গুণগত শিক্ষার স্বার্থে যোগ্যতামানের সাথে আপোষ করতে নারাজ |
শুনানির বর্তমান অবস্থা, সম্ভাব্য রায় ও শিক্ষকদের করণীয়
আজকের শুনানি সুপ্রিম কোর্টের কার্যতালিকায় ৩০১ নম্বর আইটেম হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১ ঘণ্টা ৫০ মিনিট ধরে আইনজীবীদের বক্তব্য শোনার পর হঠাৎ করেই ৩০২ নম্বর আইটেমের কাজ শুরু হয়ে যায়। ফলে সমস্ত আইনজীবীদের বক্তব্য শেষ হয়েছে কি না, পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য হলো কি না, নাকি রায় সংরক্ষিত (Judgment Reserved) রাখা হলো, তা পুরোপুরি স্পষ্ট হয়নি।
তবে আজকের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিচার করে আইনজ্ঞরা মনে করছেন যে, বিচারপতিরা তাদের বর্তমান অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো দৃশ্যমান ইঙ্গিত দেননি। শিক্ষার অধিকার আইনের সেকশন ২৩-এর সাব-সেকশন ২ (Section 23, Sub-section 2) এর উপর তারা স্থির রয়েছেন। সবদিক বিবেচনা করে মনে করা হচ্ছে, শিক্ষকদের যোগ্যতামান অর্জনের জন্য হয়তো কিছুটা অতিরিক্ত সময় (Grace Period) দেওয়া হতে পারে, কিন্তু পূর্ববর্তী রায়ের আমূল পরিবর্তনের সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।
শিক্ষকদের জন্য বিশেষ পরামর্শ: আদালতের রায়ের জন্য অপেক্ষা করার পাশাপাশি, যেসব শিক্ষকের এখনও টেট ক্লিয়ার করা নেই, তাদের উচিত অবিলম্বে আগামী টেট পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি শুরু করা। আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি পেশাগত যোগ্যতামান অর্জন করে রাখাই হবে ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পদক্ষেপ।