WB Pay Commission: সরকারি কর্মচারীদের কাছে ‘বেতন কমিশন’ একটি অত্যন্ত পরিচিত শব্দ। আমরা প্রায় সকলেই জানি যে কেন্দ্র সরকার এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বেতন কমিশনের সংখ্যার মধ্যে দীর্ঘদিনের একটি ব্যবধান রয়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীরা সপ্তম কেন্দ্রীয় বেতন কমিশন (7th CPC)-এর আওতায় বেতন ও ভাতা পাচ্ছেন এবং অষ্টম পে কমিশন গঠনের প্রস্তুতিও দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গে এখনও ষষ্ঠ বেতন কমিশন বা রোপা-২০১৯ কার্যকর রয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হল, এই সংখ্যাগত পার্থক্যের সূত্রপাত ঠিক কোথায়? কেন কেন্দ্র সপ্তম বেতন কমিশনে পৌঁছে গেলেও পশ্চিমবঙ্গ এখনও ষষ্ঠ বেতন কমিশনে রয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে স্বাধীনতা-পূর্ব ভারতের ইতিহাসে।
সূচিপত্র
কেন্দ্রীয় বেতন কমিশনের সূচনা
কেন্দ্রীয় বেতন কমিশনের ইতিহাস শুরু হয় ভারতের স্বাধীনতার আগে।
- প্রথম কমিশন: ১৯৪৬ সালের মে মাসে শ্রীনিবাসন বরদাচারিয়ার সভাপতিত্বে তৎকালীন সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা পুনর্বিন্যাসের উদ্দেশ্যে ভারতের প্রথম বেতন কমিশন গঠিত হয়।
- রিপোর্ট পেশ: ৩০ এপ্রিল ১৯৪৭ তারিখে, অর্থাৎ স্বাধীনতার কয়েক মাস আগে এই কমিশন তাদের রিপোর্ট জমা দেয়।
- বেতন কাঠামো: সিদ্ধান্ত হয় যে ১ এপ্রিল ১৯৪৬ থেকে সংশোধিত বেতন কার্যকর হবে। ১৯৪৪ সালের মূল্যসূচককে (১০২) ভিত্তি করে সর্বনিম্ন বেতন ৫৫ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
এভাবেই কেন্দ্রীয় বেতন কমিশনের যাত্রা শুরু হয় এবং পর্যায়ক্রমে দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম বেতন কমিশন কার্যকর হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের বেতন পুনর্বিন্যাস এবং প্রথম ব্যবধান
পশ্চিমবঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের বেতন কমিশনের ইতিহাস কিছুটা ভিন্ন, আর এখানেই লুকিয়ে আছে ব্যবধানের আসল কারণ।
১৯৪৪ সালের ডিসেম্বর মাসে তৎকালীন বাংলার গভর্নরের নির্দেশে “Bengal Administrative Enquiry Committee” গঠিত হয়। আর্চিবল্ড রোল্যান্ডসের নেতৃত্বাধীন এই কমিটির মূল কাজ ছিল প্রশাসনিক সংস্কারের পাশাপাশি কর্মচারীদের বেতন-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করা। কমিটি ১৯৪৫ সালে রিপোর্ট জমা দেয় এবং স্বাধীনতার পর ১ এপ্রিল ১৯৫০ থেকে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই কমিটির সুপারিশগুলি কার্যকর করে।
তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে বেতন কাঠামো পরিবর্তিত হলেও, পশ্চিমবঙ্গ সরকার এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে “প্রথম বেতন কমিশন” হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। আর ঠিক এখান থেকেই শুরু হয় কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সংখ্যাগত ব্যবধান।
পশ্চিমবঙ্গের প্রথম ও কেন্দ্রীয় দ্বিতীয় বেতন কমিশন
পরবর্তী কমিশনগুলির ইতিহাস দেখলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে যাবে।
- কেন্দ্রীয় দ্বিতীয় কমিশন: ১৯৫৭ সালের আগস্টে গঠিত হয় এবং ১৯৫৯ সালের আগস্টে রিপোর্ট জমা দেয়। এর ভিত্তিবর্ষ ছিল ১৯৪৯=১০০ এবং মূল্যসূচক ছিল ১১৮।
- পশ্চিমবঙ্গের প্রথম কমিশন: ১৬ আগস্ট ১৯৫৯ সালে অবসরপ্রাপ্ত আইসিএস অফিসার বি. দাসের সভাপতিত্বে গঠিত হয়। উল্লেখযোগ্য ভাবে, এই কমিশনের ভিত্তিবর্ষ এবং মূল্যসূচক কেন্দ্রীয় দ্বিতীয় কমিশনের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।
অর্থাৎ, কেন্দ্র যে আর্থিক পরিস্থিতিকে বিবেচনা করে তাদের দ্বিতীয় বেতন কমিশন কার্যকর করছিল, পশ্চিমবঙ্গ ঠিক একই আর্থিক ভিত্তিকে ধরে তাদের প্রথম বেতন কমিশন গঠন করে।
বর্তমান পরিস্থিতি ও উপসংহার
| সময়কাল / পর্যায় | কেন্দ্রীয় সরকার | পশ্চিমবঙ্গ সরকার |
|---|---|---|
| ১৯৪৬ – ১৯৫০ | প্রথম বেতন কমিশন | স্বীকৃতিহীন (রোল্যান্ডস কমিটি) |
| ১৯৫৯ – ১৯৬১ | দ্বিতীয় বেতন কমিশন | প্রথম বেতন কমিশন |
| বর্তমান সময় | সপ্তম (অষ্টম প্রস্তুতির পথে) | ষষ্ঠ (রোপা-২০১৯) |
পরবর্তীকালে রাজ্যে পর্যায়ক্রমে রোপা-১৯৮১ (দ্বিতীয়), রোপা-১৯৯০ (তৃতীয়), রোপা-১৯৯৮ (চতুর্থ), রোপা-২০০৯ (পঞ্চম) এবং রোপা-২০১৯ (ষষ্ঠ) কার্যকর হয়।
সুতরাং বলা যায়, কেন্দ্র ও রাজ্যের বেতন কমিশনের এই সংখ্যাগত পার্থক্য সরকারের কোনও সাম্প্রতিক বঞ্চনা বা সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি প্রশাসনিক ইতিহাসের উত্তরাধিকার। ১৯৪৪ সালের একটি কমিটিকে ‘বেতন কমিশন’-এর আনুষ্ঠানিক মর্যাদা না দেওয়ার সিদ্ধান্তই রাজ্যকে সংখ্যার বিচারে চিরকাল এক ধাপ পিছিয়ে রেখেছে।










