WB DA Arrears: পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া মহার্ঘ ভাতা (DA) নিয়ে একটি বড়সড় এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আপডেট সামনে এল। গত 8 আগস্ট সুপ্রিম কোর্টে বকেয়া ডিএ মামলার শুনানিতে মাননীয় বিচারপতিগণ নির্দেশ দেন যে, মনিটরিং কমিটির রিপোর্টগুলি মামলাকারী সংগঠনগুলিকে দুই দিনের মধ্যে জমা করতে হবে। সেই নির্দেশ মেনেই দুটি রিপোর্ট মামলাকারী সংগঠনগুলিকে দিয়েছে মনিটরিং কমিটি। সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া কমিটির দুটি গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্টগুলি থেকে রাজ্য সরকারের বকেয়া মেটানোর অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেছে। এই আর্টিকেলে আমরা সেই রিপোর্টের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করব।
সূচিপত্র
ঘটনার প্রেক্ষাপট: কেন গঠিত হয়েছিল এই মনিটরিং কমিটি?
৫ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে সুপ্রিম কোর্টের একটি ঐতিহাসিক রায়ের ভিত্তিতে জাস্টিস ইন্দু মালহোত্রার (প্রাক্তন সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতি) নেতৃত্বে এই মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির মূল কাজ হলো ২০০৮ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের যে বকেয়া DA পাওনা রয়েছে, তা All India Consumer Price Index (AICPI) অনুযায়ী সঠিকভাবে মেটানো হচ্ছে কি না, তা তদারকি করা। কমিটিতে অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন জাস্টিস তরলোক সিং চৌহান, জাস্টিস গৌতম ভাদুড়ি এবং ডেপুটি ক্যাগ শ্রী কে.এস. সুব্রহ্মণ্যন।
মনিটরিং কমিটিতে কারা রয়েছেন?
| পদ | নাম |
|---|---|
| চেয়ারপার্সন | বিচারপতি ইন্দু মালহোত্রা (প্রাক্তন বিচারপতি, সুপ্রিম কোর্ট) |
| সদস্য | বিচারপতি তারলোক সিং চৌহান (প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি, ঝাড়খণ্ড হাইকোর্ট) |
| সদস্য | বিচারপতি গৌতম ভাদুড়ি (প্রাক্তন বিচারপতি, ছত্তিশগড় হাইকোর্ট) |
| সদস্য | কে.এস. সুব্রমনিয়ন (ডেপুটি ক্যাগ) |
এই কমিটি ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে কাজ শুরু করে এবং ২৯ জুন ২০২৬ পর্যন্ত মোট ৯টি বৈঠক করেছে রাজ্যের মুখ্যসচিব ও অর্থসচিবের সঙ্গে।
সর্বশেষ পরিসংখ্যান: কত টাকা মেটানো হল?
১৫ জুলাই ২০২৬ তারিখের স্টেটাস অ্যাফিডেভিট অনুযায়ী, ২০০৮-২০১৯ সম্পূর্ণ সময়কালের জন্য মোট ৭,৭৭১.২১ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে ৭.৫ লক্ষেরও বেশি কর্মী ও পেনশনভোগীকে। বিস্তারিত হিসাব নিচে দেওয়া হল।
২০১৬-২০১৯ সময়কালের DA বকেয়া (সার্ভিং ও প্রাক্তন কর্মচারী)
| ক্যাটাগরি | লক্ষ্যমাত্রা (কর্মী সংখ্যা) | লক্ষ্য টাকা (কোটি) | টাকা পেয়েছেন (সংখ্যা) | বিতরিত টাকা (কোটি) |
|---|---|---|---|---|
| সার্ভিং গ্রুপ A, B, C (GPF অ্যাকাউন্টে) | 2,16,261 | 2,960.16 | 2,11,180 | 2,899.25 |
| সার্ভিং গ্রুপ D (ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে নগদ) | 30,492 | 226.51 | 29,606 | 221.59 |
| প্রাক্তন কর্মচারী (অবসরপ্রাপ্ত/প্রয়াত/পদত্যাগী) | 1,41,545 | 1,997.00 | 1,28,582 | 1,906.44 |
| মোট DA বকেয়া | 3,88,298 | 5,183.67 | 3,69,368 | 5,027.28 |
২০১৬-২০১৯ সময়কালের DR বকেয়া (পেনশনভোগী)
| ক্যাটাগরি | লক্ষ্যমাত্রা | লক্ষ্য টাকা (কোটি) | টাকা পেয়েছেন | বিতরিত টাকা (কোটি) |
|---|---|---|---|---|
| পেনশনভোগী | 2,67,975 | 1,764.25 | 2,06,146 | 1,463.69 |
| ফ্যামিলি পেনশনভোগী | 96,358 | 510.50 | 73,418 | 426.07 |
| মোট DR বকেয়া | 3,64,333 | 2,274.75 | 2,79,564 | 1,889.76 |
২০০৮-২০১৫ সময়কালের DR বকেয়া (ট্রেজারি-ভিত্তিক পেনশনভোগী)
| ক্যাটাগরি | লক্ষ্যমাত্রা | লক্ষ্য টাকা (কোটি) | টাকা পেয়েছেন | বিতরিত টাকা (কোটি) |
|---|---|---|---|---|
| পেনশনভোগী | 2,39,535 | 870.83 | 1,74,461 | 640.31 |
| ফ্যামিলি পেনশনভোগী | 87,677 | 274.28 | 64,831 | 213.86 |
| মোট | 3,27,212 | 1,145.11 | 2,39,292 | 854.17 |
গ্রুপ অনুযায়ী কীভাবে টাকা মেটানো হচ্ছে?
- গ্রুপ A, B ও C: বকেয়া টাকা জেনারেল প্রভিডেন্ট ফান্ড (GPF) অ্যাকাউন্টে জমা হচ্ছে, যাতে ২৪ মাসের লক-ইন পিরিয়ড থাকবে (সুদ পাওয়া যাবে)।
- গ্রুপ D (চৌকিদার, পিয়ন, সুইপার প্রভৃতি): কমিটি নির্দেশ দিয়েছিল, তাঁদের ক্ষেত্রে GPF-এ না রেখে সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে নগদ টাকা দিতে হবে।
- পেনশনভোগী ও ফ্যামিলি পেনশনভোগী: সরাসরি নগদে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা।
- প্রয়াত কর্মচারীদের ক্ষেত্রে: যাঁদের তথ্য WBiFMS-এ রয়েছে, তাঁদের বকেয়া ফ্যামিলি পেনশনভোগীর অ্যাকাউন্টে যাচ্ছে। যাঁদের তথ্য নেই বা নিয়মিত ফ্যামিলি পেনশনভোগী নেই, তাঁদের জন্য পৃথক প্রকল্প (Annexure A-II) তৈরি হয়েছে।
২০০৮-২০১৫ সময়কালের বকেয়া: নতুন কিস্তি পরিকল্পনা
প্রথমে রাজ্য সরকার ১০ কিস্তিতে ৫ বছরে (জুলাই ২০৩১ পর্যন্ত) এই বকেয়া মেটানোর প্রস্তাব দিয়েছিল, যা কমিটি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য বলে বাতিল করে দেয়। পরে রাজ্য সরকার সংশোধিত প্রকল্প জমা দেয়, যাতে বলা হয়েছে টাকা মেটানো হবে ৪টি কিস্তিতে:
| কিস্তি | নির্ধারিত সময় |
|---|---|
| ১ম কিস্তি | জুলাই ২০২৬ |
| ২য় কিস্তি | জানুয়ারি ২০২৭ |
| ৩য় কিস্তি | জুলাই ২০২৭ |
| ৪র্থ কিস্তি | জানুয়ারি ২০২৮ |
রাজ্য সরকার জানিয়েছে, প্রথম কিস্তির টাকা দেওয়া জুন ২০২৬ থেকেই আগাম শুরু হয়ে গিয়েছে। পাশাপাশি, ট্রেজারি-ভিত্তিক পেনশনভোগীদের ২০০৮-২০১৫ সময়ের DA/DR বাবদ ২২ জুন ২০২৬ পর্যন্ত ইতিমধ্যে প্রায় ৮৫২.৮৪ কোটি টাকা ২,৩৮,৯৫৮ জনকে দেওয়া হয়ে গেছে।
কলকাতার ব্যাঙ্ক থেকে পেনশন পাওয়া প্রবীণদের জন্য বিশেষ ঘোষণা
কলকাতা পুরনিগম (KMC) এলাকায় বিভিন্ন তফসিলি ব্যাঙ্ক থেকে পেনশন পাওয়া প্রবীণদের ক্ষেত্রে ডেটা সংগ্রহ ও যাচাইয়ে দেরি হচ্ছিল। এই সমস্যা সমাধানে অর্থ দফতর একটি বিশেষ পোর্টাল (Bank Pension Management Portal) তৈরি করেছে, যার ট্রায়াল রান স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার সঙ্গে ২২-২৩ জুন ২০২৬-এ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
- ৭ জুলাই ২০২৬-এর বিজ্ঞপ্তি নং ১২৫-F(Pen) অনুযায়ী, সম্পূর্ণ যাচাইয়ের আগে সদিচ্ছার নিদর্শন হিসেবে ২০০৮-২০১৯ সময়কালের আনুমানিক বকেয়ার ৫০% অ্যাডহক হারে জুলাই ২০২৬ শেষ হওয়ার আগেই দেওয়া হবে।
- এই তালিকায় রয়েছে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (১৪,১৯৭টি PPO), পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক (৪,৭৮৬টি), ইন্ডিয়ান ব্যাঙ্ক (২,০৩৫টি) সহ মোট ১২টি ব্যাঙ্ক।
রাজ্যের বাইরে থাকা পেনশনভোগীদের কী হবে?
প্রিন্সিপাল অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেলের রিপোর্ট অনুযায়ী, মোট ১,৫৯৬ জন পেনশনভোগী/ফ্যামিলি পেনশনভোগী পশ্চিমবঙ্গের বাইরে থেকে পেনশন তুলছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিহারে (৭১৪ জন), তারপর উত্তরপ্রদেশ (৩৬৩ জন), ওড়িশা (২৬৯ জন) এবং ঝাড়খণ্ড (১৬৭ জন)। সংশ্লিষ্ট রাজ্যের অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল অফিসগুলিকে DR হারের তথ্য পাঠানো হয়ে গেছে, যাতে তারাও নিজস্ব ট্রেজারির মাধ্যমে বকেয়া মেটাতে পারে।
ই-সার্ভিস বুক আপডেট: কেন জরুরি?
২০০৮-২০১৫ সময়ের বকেয়া হিসাব করতে কর্মীদের ম্যানুয়াল সার্ভিস বুকের তথ্য কম্পিউটারাইজড করা প্রয়োজন। ৭ জুলাই ২০২৬-এর হিসাব অনুযায়ী:
- মোট ৬০,৬০৬ জন কর্মীর ই-সার্ভিস বুক স্ক্যান ও আপলোড সম্পূর্ণ হয়েছে।
- ১,৩২,৮৬২ জন কর্মী প্রক্রিয়া শুরু করেছেন।
- এখনও ২,৬০,৩৪৯ জন কর্মী প্রক্রিয়া শুরুই করেননি।
করণীয়: যাঁরা এখনও নিজের সার্ভিস বুক আপডেট করেননি, তাঁদের দ্রুত সংশ্লিষ্ট পোর্টালে গিয়ে তথ্য আপলোড করা উচিত, নাহলে ২০০৮-২০১৫ সময়ের বকেয়া পেতে দেরি হতে পারে।
এখনও কত টাকা বাকি আছে?
১৫ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী নিম্নলিখিত পরিমাণ টাকা এখনও বিতরণ বাকি:
- ২০১৬-২০১৯ সময়কালের সার্ভিং ও প্রাক্তন কর্মচারীদের জন্য বাকি: ১৫৬.৩৮ কোটি টাকা (১৮,৯৮০ জন)
- ২০১৬-২০১৯ সময়কালের পেনশনভোগী/ফ্যামিলি পেনশনভোগীদের জন্য বাকি: ৩৮৪.৯৮ কোটি টাকা (৮৪,৭৬৯ জন)
- ২০০৮-২০১৫ সময়ের ট্রেজারি-ভিত্তিক পেনশনভোগীদের জন্য বাকি: ২৯০.৯৩ কোটি টাকা (৮৭,৯২০ জন)
রিপোর্টে জানানো হয়েছে, লাইফ সার্টিফিকেট জমা না দেওয়া, বৈধ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট তথ্যের অভাব, বদলি হওয়া পেনশন কেস এবং কিছু আইনি জটিলতার কারণে এই বকেয়া আটকে রয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ সময়রেখা এক নজরে
- ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: সুপ্রিম কোর্টের মূল রায়
- ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: মনিটরিং কমিটি গঠিত
- ২৩ মার্চ ২০২৬: ২০১৬-১৯ সময়ের বকেয়া ১০০% AICPI অনুযায়ী মেটানোর নির্দেশ
- ৩০ এপ্রিল ২০২৬: কমিটির ১ম অন্তর্বর্তী রিপোর্ট পেশ (মোট ৭টি বৈঠক)
- ২৮ মে ২০২৬: ৮ম বৈঠক, ২০০৮-১৫ প্রকল্প বাতিল ও পুনর্গঠনের নির্দেশ
- ২৯ জুন ২০২৬: ৯ম বৈঠক, সংশোধিত ৪-কিস্তি প্রকল্প অনুমোদন
- ৭ জুলাই ২০২৬: কলকাতার ব্যাঙ্ক-পেনশনভোগীদের জন্য ৫০% অ্যাডহক বিজ্ঞপ্তি জারি
- ২২ জুলাই ২০২৬: কমিটির ২য় অন্তর্বর্তী রিপোর্ট পেশ
- ৩ আগস্ট ২০২৬: কমিটির পরবর্তী বৈঠক নির্ধারিত
গ্রান্ট-ইন-এইড (Grant-in-aid) এবং শিক্ষকদের প্রসঙ্গে
তবে এটা জানিয়ে রাখা ভালো যে, সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া মনিটরিং কমিটির এই দুটি অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্টের কোথাও আলাদাভাবে ‘গ্রান্ট-ইন-এইড’ (Grant-in-aid) কর্মচারী, শিক্ষক বা শিক্ষাকর্মীদের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। রিপোর্ট দুটিতে বকেয়া প্রাপকদের মূলত কর্মরত কর্মচারীদের ক্ষেত্রে গ্রুপ এ, বি, সি এবং ডি ক্যাটেগরিতে এবং প্রাক্তনদের ক্ষেত্রে পেনশনার ও ফ্যামিলি পেনশনার হিসেবে ভাগ করে পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। তাই রিপোর্ট থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা অন্যান্য গ্রান্ট-ইন-এইড সংস্থার কর্মীদের বকেয়া সংক্রান্ত কোনো নির্দিষ্ট তথ্য সরাসরি পাওয়া যায়নি।
সুপ্রিম কোর্টের কড়া নজরদারিতে গঠিত এই মনিটরিং কমিটির সুপারিশে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ধাপে ধাপে হলেও বকেয়া DA মেটানোর কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ২০১৬-২০১৯ সময়কালের বেশিরভাগ বকেয়াই মিটে গেলেও, ২০০৮-২০১৫ সময়ের বকেয়া সম্পূর্ণভাবে মেটাতে ২০২৮ সাল পর্যন্ত সময় লাগবে বলে জানা যাচ্ছে।









